পলাশ হোসেন :
সবজি চাষে রাসায়নিকের পরিবর্তে জৈব প্রযুক্তির ব্যবহারে সফল হয়েছেন পাবনার কৃষকেরা। এতে বিষমুক্ত সবজি উৎপাদনের পাশাপাশি কমেছে উৎপাদন খরচ। জৈব প্রযুক্তি সম্প্রসারণে সরকারি বেসরকারি উদ্যোগের সফলতায় আগামীতে জেলায় সবজি চাষ শতভাগ রাসায়নিক মুক্ত করার প্রত্যাশা কৃষিবিভাগের।
সদর ও আটঘরিয়া উপজেলা সহ জেলার বিভিন্ন উপজেলাতে উল্লেখযোগ্য হারে শীতের সবজির আবাদ হয়। শিম উৎপাদনে সুখ্যাতি ও প্রাচুর্যের কারণে ঈশ্বরদী উপজেলার মুলাডুলী গ্রামের পরিচিতি শিম সাগর নামে। সদর উপজেলার দাপুনিয়া ও আটঘরিয়া উপজেলার কয়েকটি গ্রাম সহ বিভিন্ন উপজেলাতেই কম বেশি আবাদ হয় শিম ও অন্যান্য সবজির। সরেজমিনে দেখা যায়, অনেক চাষিরাই এ শিম চাষে ব্যবহার করছেন জৈব সার। শুধু শিম নয় ফুলকপি, টমেটো, বেগুনসহ অন্যান্য ফসল চাষেও রাসায়নিক সারের পরিবর্তে ভার্মি কম্পোস্টসহ নানা ধরণের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির জৈব সার ব্যবহার করছেন চাষিরা। প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও মাটির উর্বরতা কমে যাওয়ায় গত এক দশকে জেলার এসব অঞ্চলে মাত্রাতিরিক্ত ভাবে বেড়ে যায় কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের ব্যবহার। এতে উৎপাদিত সবজি নিয়ে বিশেষজ্ঞরা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির আশংকা জানালে রাসায়নিকের ব্যবহার কমিয়ে বিষমুক্ত সবজি উৎপাদনে কৃষকদের পরামর্শ দেয় কৃষি বিভাগ। এগিয়ে আসে আশা সহ বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাও। কারিগরি প্রশিক্ষণে জৈব সার উৎপাদন শিখে, তা জমিতে ব্যবহারে কমছে ফসলের উৎপাদন খরচ। কীটনাশকের পরিবর্তে জৈব বালাই নাশক ও বিভিন্ন ফাঁদে পোকা দমন কৌশল প্রয়োগ করায় উৎপাদিত হচ্ছে পুষ্টিগুণ সম্পন্ন নিরাপদ সবজি। নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও উপকরণ সহযোগিতায় পরীক্ষামূলক প্রকল্পে সফল হওয়ায় এখন রাসায়নিকমুক্ত শিম চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন এ অঞ্চলের কৃষকরা।
আটঘরিয়া উপজেলার সবজি চাষি নুরুল জানান, আধুনিক কৃষি পদ্ধতিতে ফলন বাড়ানোর জন্য জমি এখন একটু সময়ও ফেলে রাখা হয় না। একটি সবজি উঠতে না উঠতে আরেকটির জন্য প্রস্তুতি নেয়া হয়ে থাকে এবং খুবই অল্প সময়ে নতুন আরেকটি আবাদ শুরু হয়। জমি জো (প্রস্তুতি) আনতে ও দ্রুত আবাদে যেতে অনেক সময় আমরা বিভিন্নধরনের রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করি। আবার ফলন বাড়াতেও এসব ব্যবহার করি। আমাদের জন্মানো সবজি খেয়ে নিজেদেরই রোগবালাই বেড়ে গেছে। বিভিন্ন প্রশিক্ষণে জানতে পারি, এর কারণ অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার। এজন্য আমরা এখন জৈব সার বেশি ব্যবহার করছি।
ঈশ্বরদী মুলাডুলির চাষি আসলাম জাগো নিউজকে জানান, আগে আমরা প্রচুর রাসায়নিক সার ব্যবহার করলেই এখন তা করছি না। জৈব সারের ব্যবহার বাড়িয়েছে। বিভিন্ন প্রশিক্ষণ থেকে শেখা পদ্ধতিতে জৈব সার তৈরি করে সেগুলো জমিতে দিচ্ছি। এতে একদিকে আবাদের খরচ কমতেছে, অন্যদিকে নিরাপদ সবজি উৎপাদন হচ্ছে।
আরেক কৃষক আলতাফ মালিথা জানান, রাসায়নিক সারের জায়গায় জৈব সার আর পোকা দমনের জন্য কীটনাশকের পরিবর্তে ফাঁদ সহ বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করছি। এতে আবাদে আমাদের অনেক ব্যয় কমছে। বর্তমানে সংকটের নামে সারের যে দাম বাড়ানো হয়েছে, তাতে নিরাপদ সবজি চাষ পদ্ধতি অনুসরণ করে আমরা লাভবানই হচ্ছি।
এব্যাপারে উন্নয়ন সংস্থা আশা আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক ( কৃষি) মো. শামসুদ্দিন জানান, আমরা যা খাচ্ছি তা নিরাপদ নয়। চাষিরা শুধু উৎপাদন করছেন না, নিজেদের উৎপাদিত সবজি তারাও খাচ্ছেন এবং স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছেন। তাছাড়া অতিরিক্ত মাত্রায় রাসায়নিক ব্যবহারে আবাদের ব্যয়ও বেড়েই চলেছে। এবিষয়গুলো বোঝাতে ও সচেতন করতে আশা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। কৃষি বিভাগের সহযোগিতায় জেলার বিভিন্ন জায়গার কৃষকদের নিয়ে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে স্বাস্থ্যকর সবজি ও ফসল উৎপাদনে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। কিভাবে জৈব সার তৈরি করা যায়, কীটনাশকের পরিবর্তে ফাঁদ তৈরি করে কিভাবে পোকার হাত থেকে সবজি রক্ষা করা যায়, প্রশিক্ষণে আমরা তাদের (কৃষক) সেগুলোই শেখাতে চেষ্টা করছি। শুরুতে আগ্রহ কম থাকলেও যখন তারা বিষয়গুলো বুঝতে পেরেছেন, তখন তারা এ নিরাপদ সবজি চাষ পদ্ধতিতে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন। তাছাড়া এর মাধ্যমে কৃষকদের ব্যয়ও অনেক কমছে।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত জেলায় ৫৩ হাজার ৪০ জন কৃষককে জৈব সার উৎপাদন, কীটনাশক ছাড়া পোকা দমনে ফাঁদ তৈরি ও এর সঠিক ব্যবহারে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ১৪ হাজার ৪১০, আটঘরিয়ায় ৬ হাজার ৯০০, ৫ হাজার ৮০৫, চাটমোহরে ৬ হাজার ৫৬০, ভাঙ্গুড়ায় ৩ হাজার ৪২৫, ফরিদপুরে ৩ হাজার ২৯০, বেড়ায় ৬ হাজার ২৮০, সাঁথিয়ায় ১ হাজার ৮৯০ ও সুজানগর উপজেলায় ৪ হাজার ৪৮০ জন কৃষককে এ প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। নভেম্বর পর্যন্ত জেলায় ভার্মি, ট্রাইকো, কুইক কমপোস্ট ও কমপোস্ট সহ জৈব সার উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১৪ হাজার ৩১০ মেট্রিক টন। এর বিপরোতে উৎপাদন ললক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে সাড়ে ২৫ হাজার মেট্রিক টনের মত। অনেক আবাদ বাকি রয়েছে, শুরু হলে এ জৈব সার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করবে বলে জানায় কৃষি বিভাগ।
পাবনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. জামাল উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, পূর্বে আমাদের লক্ষ্য ছিলো খাদ্য নিশ্চিত করা। এখন আমরা সেখান থেকে বেরিয়ে এসেছি। এখন আমাদের লক্ষ্য নিরাপদ খাদ্য। সেখান থেকেই নিরাপদ পুষ্টিগ্রাম সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে জেলায় সবজি উৎপাদনে রাসায়নিক ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। ধীরে ধীরে কৃষকেরা জৈব সার ব্যবহারে ব্যাপক আগ্রহ পাচ্ছেন। প্রতিনিয়ত আমরা কৃষকদের সাথে এ নিয়ে আলাপ করছি, প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে নিরাপদ সবজি ও রবিশস্য আবাদে তাদের উদ্বুদ্ধ করছি। খুব শীঘ্রই জেলার শতভাগ কৃষক নিরাপদ সবজি আবাদের আওতায় আসবেন বলেও আশাবাদ এ কর্মকর্তার।
দৈনিক এরোমনি প্রতিদিন ডটকম তথ্য মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধন প্রক্রিয়াধীন অনলাইন নিউজ পোর্টাল

